অতসীর নীরব আর্তনাদ - পর্ব ১
“আমার বাচ্চার মা হতে চলেছে অতসী। পেটে আমার বাচ্চা নিয়ে অন্য কারো সাথে বিয়ে বসতে দেবো ভাবলে কি করে?”
দাঁতে দাঁত চেপে বলে ফারজাদ। উঠে সবার মাঝে চলে এসেছে সে।
“চুপ করো সবাই।” ফারজাদের বাবার ধমকে সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলো। তিনি চোখ ফিরিয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকান, “তুমি কি বলছ তা তুমি বুঝতে পারছ ফারজাদ?”
ফারজাদ গাঁঢ় শ্বাস টেনে পূর্ণদৃষ্টিতে তার বাবাকে দেখল, রাগে কিছুটা হাঁপাচ্ছে সে। চোখ দুটো লাল হয়ে এসেছে, “হ্যাঁ, বুঝতে পারছি বাবা। হুশে থেকেই বলছি সব।”
“অতসীর সাথে জোর জবরদস্তি করেছ?”
একটু থামলো সে। নির্জীব অতসীর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলে, “হ্যাঁ,”
সাথে সাথে কারো থাপ্পর পড়লো তার গালে। ঘাড় বাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিয়েছে সে।
ফারজাদ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখল তার ছোট চাচা; অর্থাৎ অতসীর বাবা তাকে থাপ্পর দিয়েছে।
সবাই চমকিত আর আতঙ্কিত বদনে তাকায়। অতসীর মা শক্ত হয়ে বসে আছে মেয়েকে বুকে নিয়ে, আর ফারজাদের মা আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁফিয়ে উঠলেন। ফারজাদের ভাই বোনেরা সহ ফুফিরাও বিস্ময়-আতঙ্কে কথা বলতে ভুলে গেলো।
এসব কি হচ্ছে এই বাড়িতে? ফারজাদ ভাই নাকি তাদের অতসীকে জোর জবরদস্তি করেছে। ফারজাদ ভাইয়ের বাচ্চা ছোট্ট অতসীর পেটে। বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গেলো ভাই বোনেরা।
“সারাজীবন তো আমার মেয়েকে দুচোখে সহ্য করতে না পারার মতো অহংকার দেখিয়ে গেলি। আমার মেয়েটা অন্ধ বলে কম লাঞ্ছিত করিস নি যার তার সামনে। আর আড়ালে সেই মেয়েকে জবরদস্তি করিস? এই তোর অহংকার? সেই অন্ধ মেয়েটার কাছেই নিজের পুরুষত্ব বিলিয়েছিস শেষে গিয়ে। লজ্জ্বা করলো না তোর? তোর অহমিকা ভেঙে গুড়িয়ে গেলো না ফারজাদ?” অতসীর বাবার কাছে এমন কথা শুনে প্রত্যেকে বিস্মিত হলো।
মানুষটা কোনোদিন তার মেয়েকে কটুকথা বলা নিয়ে এ বাড়ির কাউকে একটা কথা শুনায়নি। শান্তিপ্রিয় বলে নীরবে যেতে দিয়েছে সব। যা পরিবারের বাকিরা দিতে পারছেনা তার মেয়েকে, তা পুষিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা নিজেই নীরবে করে গেছে সারাজীবন। তার আপন বোনেরাও যে তার ছোট্ট মেয়েটাকে পছন্দ করেনা এ কথাও জানে। তাও কোনোদিন এই নিয়ে কোনোরকম মন খারাপি প্রকাশ করেনি। সবাই তো অতসীর বাবা মায়েরও যে কষ্ট লাগতে পারে নিজেদের মেয়ের প্রতি বাড়ির মানুষদের অবহেলায়– এ কথা ভুলেই বসেছিল।
অতসীর ফুফিরাও একটু নিজেদের বিষয় আন্দাজ করতে পারল। ফারজাদকে যা বলছে, তা কোথাও তাদের উদ্দেশ্যেও- এমনটাই মনে হচ্ছে যেন।
“চাচ্চু…”
নরম কণ্ঠে কিছু বলতে যাচ্ছিল ফারজাদ।
“চুপ, কোনো কথা বলবিনা। কোনোদিন একটা টু শব্দ করিনি আমার মেয়েটার প্রতি তোদের যা তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে। নীরবে কাটিয়ে গেছি। আমরা তো থাকিওনা এ বাড়িতে, বছরে ছ-মাসে একবার দুবার আসি। তাও তোদের অতসীকে নিয়ে হাজারটা সমস্যা। ওকে খুব অপছন্দ করিস, মানলাম। ওর শুভাকাঙ্ক্ষী নোস, মানলাম। তাই বলে এভাবে শেষ করে দিলি আমার মেয়েটার জীবন? আজ আমার একটা ছেলে থাকলে, সে যদি তোর বোন প্রাচীর সাথে এমন কিছু করতো। মানতে পারতি? নাকি আমার মেয়েটা চোখে দেখেনা বলে মানুষ মনে হয়না তোর?”
সকলে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। যা হয়েছে মোটেও ভালো হয়নি।
_____
অতীত,
ফারজাদের বোন প্রিসিলার বিয়ে আজ। ফারিশ মহলের ভেতরসহ বাহিরটাও খুব সুন্দর, আর মনোরমভাবে সাজানো হয়েছে।
বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে উঠোন পর্যন্ত পুরো জায়গাটা সুন্দরভাবে সাজানো। ফটকের দু’পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার সাথে রঙিন কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খুঁটির মাথায় ঝোলানো কাগজের লণ্ঠন আর ছোট ছোট বৈদ্যুতিক বাতি। বাতিগুলো এখনও পুরো জ্বলেনি, তবু দিনের আলোয় তার আর তারের গুছানো সাজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে লম্বা কাপড়ের ছাউনি। নীল, সাদা আর হালকা সোনালি রঙের কাপড় একটার সাথে আরেকটা ভাঁজ করে টানানো। ছাউনির নিচে হাঁটার পথটা আলাদা করে চিহ্নিত করা - দু’পাশে সারি করে ফুলের টব রাখা। টবের ভেতর গাঁদা আর গোলাপ গাছ, কিছু গাছে আবার কাগজের ফুল বেঁধে দেওয়া। উঠোনের মাঝখানে বিয়ের মূল আয়োজনের জায়গা। সেখানে কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি মঞ্চটা একটু উঁচু করে বানানো। মঞ্চের সামনে সারি সারি চেয়ার পাতা। বাড়ির দেয়ালগুলোও খালি রাখা হয়নি। জানালা আর দরজার ফ্রেমে ফুলের মালা ঝুলছে। কোথাও কোথাও রঙিন কাপড়ের ছোট পর্দা লাগানো। দোতলার বারান্দায় রেলিং জুড়ে লাইটের তার পেঁচানো। রাত হলে পুরো বাড়িটা আলোয় ভরে উঠবে।
সব মিলিয়ে সাজটা খুব ঝকঝকে এক অভিজাত অনুভব দিচ্ছে।
রান্নাঘরের ভেতরটা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত।
“পায়েসটা আরেকটু নাড়ুন আপা, তলায় লেগে যাচ্ছে।”
বাড়ির বড় বউ, অর্থাৎ ফারজাদের মা তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বললেন, রান্নাঘরের সব কিছু তদারকি করছেন তিনি। বিয়ে বাড়ির জন্য কয়েকজন রাঁধুনি রাখা হয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্যেই কথাটা। সবটা পর্যবেক্ষণ করতে করতে আরেকজনকে বললেন,
“এই লুচিগুলো সাবধানে তুলিস, পোড়া হলে দেখতে ভালো লাগবেনা, মা বকবেন।”
“চেষ্টা করছি আপা। পুড়াবনা, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। সকাল থেকে এটা ওটা নিয়ে ছুটছ এদিক ওদিক। মেয়ে বিদায় করে তোমাকে নিয়ে না ছুটতে হয় আবার। একটু স্বস্তি দাও নিজেকে। সবাই তো আছি।”
মেজ জা-র কথায় ফারজাদের মা উত্তর দিল,
“নিশ্চিন্তে থাকা যায় বিয়ে বাড়িতে? কতো দিক দেখতে হয়, বরযাত্রীর কোনোকিছু অপছন্দ হোক চাইনা।”
____
বসার ঘরে একপাশে ফারজাদের মামাতো ফুফাতো বোনেরা একসাথে বসে মেহেন্দি পড়ছে হাতে। হাসতে হাসতে তার এক বান্ধবী বলল,
“ভাবতে পারিস? পূর্ণতা আপুর আজ বিয়ে! সেদিনই তো আমাদের সাথে গল্প করছিল বিয়ে করবেনা। ছেলে মানুষকে নাকি বিশ্বাস করা যায়না।”
“এসব সবাই বলে! পরে স্বামীর আদর পেলে বিয়ের আগের ভুত উড়ে যায়। তখন পতি হয়ে যায় পরমেশ্বর।”
হাসির রোল উঠল।
____
প্রিসিলা সাজঘরে বসে আছে। আয়নার সামনে তাকে ঘিরে বান্ধবীরা। কেউ টিকলি সোজা করে দেওয়ার কথা বলছে, কেউ গয়নার ক্লিপ ঠিক করে দিচ্ছে। তাদের একেকরকম খুনশুটি মিশ্রিত কথা। পূর্ণতা হেসে বলে,
“এবার একটু চুপ করতো তোরা, মাথা ঘুরছে আমার।”
বান্ধবী মারিয়া মজা করে বলল, “এটা মাথা ঘোরা না রে, এটা বিয়ের উত্তেজনা!”
সবাই হেসে উঠে। সেই হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল ঘরের বাইরে পর্যন্ত।
এই সব কোলাহলের মাঝেই দাদী এক কোণে বসে আছেন। সাদা শাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে হাসি আছে, কিন্তু চোখ দুটো অস্থির। বারবার কারো দিকে তাকান।
নাতি আরমানকে দেখেই ডাক দিলেন,
“হ্যাঁ রে আরমান। ওদের ফোন কর তো। দেখ কতদূর এলো।”
“ফোন করেছিলাম দাদী, মাঝরাস্তায় আছে। কিন্তু একটা দুঃসংবাদ আছে তোমার জন্য।”
“কি বলছিস? কি দুঃসংবাদ? ওরা ঠিকঠাক আসতে পারছে তো? সবাই সুস্থ আছে?” দাদীর চিন্তিত কণ্ঠের একেক প্রশ্নে আরমান বলে,
“আরে এত উত্তেজিত হয়ে পড়ছ কেন? যেমন ভাবছ তেমন কিছুই না। সবাই সুস্থ আছে। সমস্যা হচ্ছে তোমার নাতনি অতসী, সে আসছে না ছোট চাচ্চু আর চাচিমণির সাথে। সে নাকি খালার বাড়ি গেছে।”
দাদীর কুঁচকানো চামড়ার ললাটে ভাঁজ পড়ে,
“মানে? আমার অতসী দিদিভাই আসছে না? এটা কেমন ধারা কথা? ছোট খোকাকে ফোন লাগা দেখি, ফোন দিয়ে আমার কাছে দে।”
আরমান আপেলে কামড় লাগিয়ে ফোন লাগায় ছোট চাচ্চুকে। দুইবার রিং হতেই রিসিভ করলো,
“হ্যাঁ, চাচ্চু। দাদীর সাথে কথা বলো একটু।” কথাটা বলে দাদিকে ফোন দেয়।
বৃদ্ধা ফোন কানে লাগিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলেন,
“হ্যাঁ রে ছোট খোকা? আরমান কি বলছে? অতসী দিদিভাই নাকি আসছে না? এটা কেমন ধারা কথা? বাড়িতে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান, আর মেয়েকে তুই খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিলি?”
অতসীর বাবা নিজের মাকে বলেন,
“হ্যাঁ মা, অতসীর নাকি বিয়ে বাড়ি এটেন্ড করতে ভালো লাগছে না। কিছুদিন ধরে একটু অসুস্থ যাচ্ছে ওর শরীরটা। ঠিকঠাক খেতে পারেনা। কেমন দুর্বল দুর্বল। বিয়েতে আসতে চাইছিল না। মানুষজনের ঝামেলার মধ্যে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে ভেবে আমিও ভাবলাম নাই আসুক। এখন ওকে বাড়িতে একা একা তো আর রেখে আসতে পারিনা। তাই খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।”
দাদীর ভালো লাগল না। নাখোশভাব চেহারায়।
“তাই বলে খালার বাড়িই পাঠিয়ে দিবি? আমি নাহয় ওর জন্য কোনো একটা ব্যবস্থা করতাম এখানে। আমাকে না জানিয়ে আমার নাতনিকে ছাড়া একা একা চলে আসছিস। কাজটা ঠিক করলি না।”
মায়ের কথায় অতসীর বাবা বলেন,
“আহা… রাগ করছ কেন? বিয়ে বাড়িতে কতো কাজ-বাজ থাকে। এসবের মধ্যে তোমাদের ঝামেলায় ফেলতে চাইনি। তাছাড়া বললেই ব্যবস্থা করা যায় নাকি? অতো মানুষজনের মধ্যে কোথাও শান্ত পরিবেশ পাওয়া টাফ। তার চেয়ে ওখানেই ঠিক আছে ও।”
“প্রিসিলাকে দেখতে আসার দিনও তো ঠিক ছিল অতসী। এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লো?” দাদীর চিন্তিত কণ্ঠ
“বলো না আর। সেদিন ও বাড়ি থেকে চলে আসার সময়তে আরও অসুস্থবোধ করছিল। তখন কিছু জানায়নি আমাদের। বাড়ি এসে দেখি দাড়াতেও পারছেনা ঠিকঠাক। আবার ওর মা যত্ন আত্তি করলো। কি জানি কি হয়েছে! বুঝতে পারছি না কিছু। ডক্টরের কাছেও যেতে চায় না। সেদিন থেকেই কেমন মনমরা মনমরা হয়ে থাকে।”
আরও অল্পস্বল্প কথা বলে ফোন কেটে দিলেন অতসীর বাবা। ওমনি পাশ থেকে স্ত্রীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
“আমার মনে হয় জোর করে হলেও ডক্টর দেখিয়ে ফেলা উচিত ছিল আমার মেয়েটাকে। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে খেয়াল করেছেন?”
অতসীর বাবা মাথা নেড়ে বলেন,
“হুম, তা তো আমিও খেয়াল করেছি অতসীর আম্মু। ভাবছি বিয়েটার ঝামেলা মিটে গেলেই, বাড়ি ফিরে ওকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যাবো।”
“হু, তাই ঠিক হবে।”
অতসীর বাবা মায়ের কথোপকথন শেষ হয়। প্রিসিলাকে পাত্রপক্ষ হতে দেখতে আসায় ফারিশ মহল এসেছিলেন কিছুদিন আগে তারা স্বামী স্ত্রী, নিজেদের একমাত্র মেয়ে অতসীকে নিয়ে। সারাদিন সুস্থ স্বাভাবিকই ছিল। এমনকি পরদিনও পুরোটা দিন রুমবন্দি থাকে। ভেবেছিল স্বাভাবিক ন্যায় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে তাদের মেয়ে। কিন্তু বিকেল হলে বাড়ি ফেরার সময় মেয়েটাকে কেমন মনমরা, শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত দেখালো। এরপর বাড়ি গিয়েও আরও গুরুতর অবস্থা। দাড়াতে অব্দি পারেনি। এরপর বেশ কিছুদিন কেটে যায়। কিন্তু আর আসা হয়নি ফারিশ মহল।
আসার কথাও না। যা হয়েছে এরপর বিয়েতে কোনোভাবেই আসতো না অতসী। সে আর কোনোদিন ফারিশ মহলের চৌকাটে পা রাখতে চায়না। না ঐ মানুষটার সামনে পড়তে চায়, যে তার অপূর্ণতার জীবনে কলঙ্ক লাগিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করে দিয়েছে।
~চলবে~
প্রেমভুবনের_অতসী
অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী
পর্ব- ১,,
