অতসীর নীরব আর্তনাদ - পর্ব–৪ : শেষ সিদ্ধান্ত

অতসীর নীরব আর্তনাদ

পর্ব–৪ : শেষ সিদ্ধান্ত

ফারিশ মহলের বৈঠকখানাটা অদ্ভুত নীরব।

দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও আজ যেন কানে লাগে। সবাই বসে আছে—কেউ চোখ নামিয়ে, কেউ শক্ত হয়ে। মাঝখানে অতসী। সাদা শাড়ি, চোখে কালো চশমা। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।

তার পাশে মা। হাত শক্ত করে ধরে আছে মেয়ের।

ফারজাদ দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। বুকের ভেতর জমে থাকা সব অহংকার, ভয় আর অপরাধবোধ একসাথে চেপে বসেছে। আজ পালানোর কোনো রাস্তা নেই—সে নিজেই জানে।

“বল,” ফারজাদের বাবার কণ্ঠ ভারী, “তুই যা বলেছিলি, সেটা সত্য?”

ফারজাদ চোখ তোলে না। গলা শুকিয়ে আসে।

“হ্যাঁ,” বলে সে, “সত্য।”

ঘরে একটা শ্বাসরুদ্ধ নীরবতা নামে।

অতসীর বাবা উঠে দাঁড়ান। এতদিনের নীরব মানুষটা আজ ভাঙা গলায় কথা বলেন,

“আমার মেয়েটা চোখে দেখে না—তাই কি সে মানুষ না? তাই কি তার সম্মতি ছাড়া কিছু করার অধিকার তোদের আছে?”

ফারজাদ মাথা নিচু করে থাকে। কোনো উত্তর নেই।

অতসী খুব আস্তে বলে ওঠে,

“আমি বিচার চাই না।”

সবাই চমকে তাকায় তার দিকে।

“আমি শুধু সত্যটা সবাই জানুক—এটাই চেয়েছি,” বলে সে। কণ্ঠ কাঁপে না।

“আর একটা সিদ্ধান্ত নিতে এসেছি।”

মা বিস্ময়ে তাকান।

“কি সিদ্ধান্ত মা?”

অতসী সোজা হয়ে বসে।

“আমি এই বাড়ির কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। কোনো বিয়ে, কোনো দায়—কিছু না।”

ঘরে ফিসফাস ওঠে।

ফারজাদের মা কান্না চেপে বসে আছেন।

ফারজাদ হঠাৎ বলে ওঠে,

“আমি দায় নিতে চাই। বিয়েটা—”

“না,” অতসীর কণ্ঠ এবার কঠোর।

“আমাকে আর কোনো কিছুর বিনিময়ে বন্দী হতে হবে না।”

একটু থেমে সে যোগ করে,

“এই শিশুর দায়িত্ব আমি একাই নেব। কিন্তু মিথ্যে ভালোবাসার নামে কোনো দয়া আমি চাই না।”

ফারজাদের বাবার চোখ ভিজে ওঠে।

তিনি ধীরে বলেন,

“তোর সিদ্ধান্তই শেষ কথা।”

অতসীর বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি দেন।

“আমরা মেয়ের পাশে আছি।”

ফারজাদ বুঝে যায়—এখানেই তার সব হার।

খালার বাড়িতে ফেরে অতসী। এবার একা না—মা পাশে।

ডাক্তারের নিয়মিত চেকআপ, যত্ন, আর চারপাশে এক ধরনের নতুন শান্তি।

এক সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে অতসী। বাতাসে বেলি ফুলের গন্ধ।

মা জিজ্ঞেস করেন,

“ভয় লাগে?”

অতসী মৃদু হেসে বলে,

“আগে লাগত। এখন আর না।”

হাতটা আবার পেটের ওপর যায়।

এই জীবনটা তার—কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

মাস কেটে যায়।

অতসী নতুন করে বাঁচতে শেখে—শব্দ দিয়ে, স্পর্শ দিয়ে, সাহস দিয়ে।

একদিন সে বলে,

“আম্মা, আমি চাই… আমার মতো মেয়েদের জন্য কিছু করি। যেন তারা নীরবে ভেঙে না পড়ে।”

মা গর্বভরে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন।

ফারিশ মহলের গল্প শেষ হয় সেখানে।

কিন্তু অতসীর গল্প—সেখানেই শুরু।

কারণ সে শিখেছে—

চোখে আলো না থাকলেও,

সত্য দেখার সাহস থাকলে

অন্ধকার টেকে না।

সমাপ্ত

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url