অতসীর নীরব আর্তনাদ - পর্ব–৩ : ভাঙনের শব্দ

অতসীর নীরব আর্তনাদ

পর্ব–৩ : ভাঙনের শব্দ

খালার বাড়িতে রাত নামলে অতসীর ভেতরের অস্থিরতা আরও স্পষ্ট হয়।

দিনের আলোয় কিছুটা সামলে রাখা যায়, কিন্তু অন্ধকার নামলেই ভয়গুলো জেগে ওঠে।

বিছানার একপাশে বসে আছে সে। হাত দুটো পেটের ওপর রাখা। বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা ঢেউ ওঠানামা করছে। এই শরীরটা এখন আর শুধু তার নিজের না—এই ভাবনাটা তাকে একসাথে শক্ত আর ভেঙে দেয়।

খালা পাশের ঘর থেকে এসে বলে,

“মা, ঘুমাবি না?”

অতসী মাথা নেড়ে দেয়।

“ঘুম আসে না।”

খালা আর জোর করে না। চুপচাপ পাশে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর খুব সাবধানে প্রশ্ন করে,

“তোর আব্বা-আম্মাকে জানানো দরকার, অতসী।”

এই কথাটায় অতসীর শরীর শক্ত হয়ে যায়।

সে জানত, এই মুহূর্তটা আসবেই।

“না,” খুব ধীরে বলে সে, “এখন না।”

“কেন মা? এভাবে একা একা সব বয়ে নিলে—”

অতসী কথাটা শেষ করতে দেয় না।

“আমি পারব খালা।”

কণ্ঠে কোনো জোর নেই, তবু দৃঢ়তা আছে।

খালা বুঝে যায়, এখন আর চাপ দেওয়ার সময় না।

ফারিশ মহলে তখন ভিন্ন চিত্র।

বিয়ের বাড়ির রেশ কাটতে না কাটতেই নিত্যকার জীবনের গতি ফিরে এসেছে। কিন্তু ফারজাদের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে।

সে আগের মতো স্বাভাবিক থাকতে পারছে না।

মায়ের চোখে সেটা পড়ছে।

রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলে ওঠেন,

“কি হয়েছে রে? কদিন ধরে তোর মুখের দিকে তাকালে কেমন লাগে।”

ফারজাদ এড়িয়ে যায়।

“কিছু না মা, কাজের চাপ।”

মা আর কিছু বলে না, কিন্তু চোখে সন্দেহ জমে।

রাতে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে ফারজাদ।

মাথার ভেতর সেই নামটা ঘুরপাক খায়—অতসী।

নিজেকে বোঝাতে চায়,

“ও তো কিছু বলেনি… কাউকে কিছু বলেনি।”

কিন্তু নীরবতাও যে একরকম অভিযোগ—এই সত্যটা তাকে তাড়া করে ফেরে।

খালার বাড়িতে কয়েকদিন কাটে। অতসীর শরীর আরও দুর্বল হয়।

ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খাচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে। কিন্তু মনটা কোথাও স্থির হয় না।

এক সন্ধ্যায় খালা ফোনে কারো সাথে কথা বলে উঠে আসে।

“অতসী, তোর আব্বা ফোন করছিল। খুব চিন্তায় আছে।”

অতসী চুপ করে থাকে।

তারপর খুব আস্তে বলে,

“ওনাকে বলো… আমি ঠিক আছি।”

এই ‘ঠিক আছি’-র ভেতর কতটা মিথ্যে লুকানো, সেটা সে নিজেই জানে।

খালা ফোন রেখে এসে মেয়েটার কাঁধে হাত রাখে।

“সবসময় শক্ত থাকা যায় না মা।”

অতসীর চোখ ভিজে ওঠে।

কিন্তু কান্নাটা বেরোয় না।

“আমি দুর্বল হলে… ওরা জিতে যাবে,” বলে সে।

খালা কিছু বলে না। শুধু বুঝে নেয়—এই মেয়েটা আর আগের অতসী নেই।

একদিন দুপুরে দরজায় কড়া নাড়ে কেউ।

খালা দরজা খুলতেই চমকে ওঠে।

অতসীর মা।

মেয়েকে দেখে মায়ের বুকের ভেতর হাহাকার উঠলেও, মুখে ধরে রাখেন নিজেকে।

অতসী কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেলে।

“আম্মা…”

একটা শব্দ, কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট।

মা এগিয়ে এসে মেয়েকে বুকে টেনে নেয়।

চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

“আমার চোখের আলো… তুই এত কষ্ট পেলি, আমাকে একটুও বললি না?”

এই প্রথম অতসীর ভেতরের বাঁধ ভাঙে।

সে কাঁদে না জোরে, শুধু শরীরটা কেঁপে ওঠে।

মা কিছু না জিজ্ঞেস করেই বুঝে যায়—

কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছে।

ফারজাদ সেদিন রাতেই খবরটা পায়—

অতসীর মা খালার বাড়িতে গেছে।

বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগে।

সে জানে,

এখন আর নীরবতা তাকে বাঁচাবে না।

সত্য ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ছে।

আর দরজা ভাঙলে—

ভেতরে আর কিছুই অক্ষত থাকবে না।

চলবে…

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url