পর্ব–অতসীর নীরব আর্তনাদ - ২ : নীরবতার ভেতর রক্তাক্ত সত্য
অতসীর নীরব আর্তনাদ
পর্ব–২ : নীরবতার ভেতর রক্তাক্ত সত্য
খালার বাড়িটা অন্য সময় অতসীর কাছে স্বস্তির জায়গা ছিল।
আজ সেখানে এসে যেন আরও বেশি ভারী হয়ে উঠেছে তার বুক।
বারান্দার কোণে রাখা কাঠের চেয়ারে বসে আছে সে। চোখে আলো নেই, তবু চারপাশের নীরবতাটা সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। বাতাসে রান্না হওয়া পেঁয়াজের গন্ধ, দূরে বাচ্চাদের হাসির শব্দ—সবই আছে, অথচ অতসীর ভেতরে কিছুই নেই। যেন সবকিছু শুনছে, কিন্তু অনুভব করতে পারছে না।
হাত দুটো অজান্তেই পেটের উপর গিয়ে থামে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুকের ভেতর থেকে।
এই শরীরটাই কি এখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু?
খালার কণ্ঠ ভেসে আসে ভেতর ঘর থেকে,
“অতসী মা, কিছু খাবে? সকাল থেকে কিছু খাস নাই।”
অতসী মাথা নেড়ে দেয়। জানে, খালা সেটা দেখতে পাচ্ছে না। তবু অভ্যাসবশতই এই নড়াচড়া।
গলা শুকিয়ে আছে, কথা বেরোয় না।
খালা কাছে এসে বসে পড়ে। নরম গলায় বলে,
“তোর শরীরটা ভালো লাগতেছে না আমার। আগেও এমন হইছে?”
অতসী একটু চুপ করে থাকে। তারপর খুব আস্তে বলে,
“না খালা।”
মিথ্যেটা বলতে গিয়ে বুকের ভেতর কেমন মোচড় দেয়।
সে জানে, এটা সাধারণ অসুস্থতা না।
রাতে ঘুম আসে না অতসীর। চোখ বন্ধ করলেই সেই মুহূর্তগুলো ভেসে ওঠে।
একটা পরিচিত কণ্ঠ, পরিচিত স্পর্শ—যেটা ভয়ংকরভাবে অচেনা হয়ে গিয়েছিল।
“তুই তো দেখিস না অতসী… কেউ জানবেও না।”
কান চেপে ধরে সে। তবু শব্দগুলো থামে না।
অন্ধকারে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
ভোরের দিকে হালকা বমি ভাব শুরু হয়। খালার চোখ এড়াতে চেয়েছিল, পারেনি।
খালা জোর করে বসিয়ে দেয়।
“আর না। কালই ডাক্তারের কাছে যাবি।”
অতসী কোনো প্রতিবাদ করে না। করার শক্তি তার নেই।
ডাক্তারের চেম্বারটা ঠান্ডা। অতসীর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে খালা।
ডাক্তার কিছু প্রশ্ন করে, খালা উত্তর দেয়। অতসী শুধু শোনে।
কিছু সময় পর ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
“আমি একটা টেস্ট লিখে দিচ্ছি। আজই করাবেন।”
খালা জিজ্ঞেস করে,
“ডাক্তার… কিছু সিরিয়াস?”
ডাক্তার উত্তর দেয় না সরাসরি।
শুধু বলে,
“আগে টেস্টটা হোক।”
রিপোর্ট হাতে পেয়ে খালার হাত কেঁপে ওঠে।
চোখ দুটো একবার অতসীর দিকে যায়, আবার কাগজে নামে।
“অতসী…”
নামটা উচ্চারণ করতেই গলা ভেঙে আসে খালার।
অতসী বুঝে যায়।
আর কিছু শোনার দরকার হয় না।
“আমি জানতাম,” খুব আস্তে বলে সে।
কোনো কান্না নেই, কোনো চিৎকার নেই।
শুধু একরাশ ক্লান্তি।
খালা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“কে… কে করেছে মা?”
অতসীর ঠোঁট কাঁপে।
মুখ খুলে নামটা বলতে চেয়েও পারে না সে।
কারণ নামটা শুধু একজন মানুষের না,
নামটা একটা পরিবারের, একটা ঘরের, একটা নিরাপত্তার।
ফারিশ মহলের সেই চৌকাঠ,
যেখানে সে আর কোনোদিন পা রাখতে চায় না।
ফারজাদ তখন বোনের বিয়েবাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে।
হাসি, গান, আলো—সবকিছু তার চারপাশে।
কিন্তু তার ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি।
হঠাৎ করেই অতসীর কথা মনে পড়ে যায়।
চোখে না দেখা সেই মেয়েটার মুখ,
যাকে সে বরাবরই অবহেলা করেছে।
এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচ করে।
সে নিজেকে বোঝায়,
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু সত্য কখনো নিজে থেকে ঠিক হয় না।
চলবে…