শেষ দেখা: এক কাপ ঠান্ডা কফি আর আমাদের বিচ্ছেদের গল্প

আজ বিকেলের আকাশটা বড্ড বেশি মেঘলা। অনেকটা আমার মনের মতোই। ক্যাফের কোণার সিটটায় বসে আছি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। সামনে রাখা কফিটা জুড়িয়ে একদম ঠান্ডা জল হয়ে গেছে, ঠিক যেমন আমাদের সম্পর্কটা গত কয়েক মাসে উষ্ণতা হারিয়ে বরফশীতল হয়ে গেছে। অনিক আসবে বলেছিল চারটেয়, এখন বাজে পাঁচটা। আমি জানি ও আসবে, ও কথা দিয়ে কথা রাখে না এমনটা খুব কমই হয়েছে। কিন্তু আজ হয়তো ও আসতে চাইছে না, কিংবা এই শেষ দেখাটা ও-ও এড়িয়ে যেতে চাইছে।


কাঁচের জানলার ওপাশে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানলায় আছড়ে পড়ছে, আর আমার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে। তিন বছরের সম্পর্ক। কত স্মৃতি, কত স্বপ্ন, কত ছোট ছোট ঝগড়া আর অভিমান। সব কিছু কি আজ এই এক কাপ কফির টেবিলে শেষ হয়ে যাবে?


দরজার ঘন্টিটা বেজে উঠল। অনিক ঢুকল। পরনে সেই নীল শার্টটা, যেটা আমি গত জন্মদিনে দিয়েছিলাম। ভিজে গেছে খানিকটা। চুলগুলো এলোমেলো। ও এসে আমার সামনের চেয়ারটা টেনে বসল। কোনো কথা বলল না। আমিও চুপ। আমাদের মাঝখানের এই নীরবতাটা আজ বড্ড অপরিচিত, অথচ বড্ড সত্যি।


“অনেকক্ষণ বসে?” অনিকের গলাটা একটু ধরা।

আমি মাথা নাড়লাম, “না, এই তো।” মিথ্যে বললাম। ও জানে আমি মিথ্যে বলছি। ও আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। টেবিলে রাখা টিস্যু পেপারটা নিয়ে আনমনে ভাঁজ করছে।


“রিয়া, আমরা কি চেষ্টা করলে...” অনিক কথাটা শেষ করতে পারল না।

আমি ম্লান হাসলাম। “চেষ্টা? আর কত অনিক? সুতোয় টান পড়লে গিঁট দেওয়া যায়, কিন্তু সেই সুতো আর আগের মতো মসৃণ থাকে না। আমরা দুজনেই জানি, আমাদের রাস্তাটা এখন দুদিকে বেঁকে গেছে। জোর করে আর কতদিন পাশাপাশি হাঁটব বলো?”


অনিক এবার আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে একটা অসহায় আর্তি। ও হয়তো বা বলতে চাইছে, ‘চলো সব ভুলে আবার শুরু করি’। কিন্তু আমরা দুজনেই জানি, সেই ‘শুরু’টা আর সম্ভব না। বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে কাঁচ জোড়া লাগানোর মতো দাগ থেকে যায়। গত ছ’মাসের অবিশ্বাস, একে অপরকে না বোঝা, আর অকারণ দোষারোপ—এসবের ভারে আমাদের ভালোবাসাটা শ্বাস নিতে পারছে না।


“তোমার কি মনে হয়, আমি তোমাকে ভালোবাসিনি?” অনিক প্রশ্নটা করল।

আমি জানলার বাইরে তাকালাম। “ভালোবাসা তো ছিল অনিক। কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে কি সব হয়? সম্মান, বিশ্বাস আর ভালো রাখা—এগুলো ভালোবাসারই অন্য নাম। যখন আমি তোমার পাশে থেকেও একা অনুভব করতে শুরু করলাম, তখনই বুঝেছিলাম আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে।”


ওয়েটার এসে বিল দিয়ে গেল। অনিক মানিব্যাগ বের করতে যাচ্ছিল, আমি ওর হাতটা ধরলাম। ওর হাতটা কি ঠান্ডা! একসময় এই হাতটা ধরলেই আমার সব ভয় কেটে যেত। আজ এই স্পর্শে শুধু বিচ্ছেদের হিমশীতল স্রোত।

“থাক, আজ আমি দিই। শেষ কফিটা আমার তরফ থেকেই থাক।”


অনিক বাধা দিল না। ও হয়তো বুঝতে পারছে, আমার জেদ আর আগের মতো আদুরে নেই, এটা এখন কঠিন সিদ্ধান্ত।

আমরা যখন ক্যাফে থেকে বের হলাম, বৃষ্টিটা ধরে এসেছে। কিন্তু শহরের রাস্তায় জল জমেছে। অনিক বলল, “তোমাকে ড্রপ করে দিই?”

আমি মাথা নাড়লাম। “না। এখান থেকেই আমাদের রাস্তা আলাদা হোক। তুমি তোমার পথে যাও, আমি আমার।”


অনিক কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর আলতো করে বলল, “ভালো থেকো, রিয়া।”

কথাটা খুব ছোট, খুব সাধারণ। কিন্তু এর ওজন পাহাড়সম। আমি বললাম, “তুমিও। নিজেকে গুছিয়ে নিও।”


অনিক উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখছিলাম মানুষটাকে। যাকে আমি আমার পৃথিবী ভাবতাম, সে আজ ভিড়ের মধ্যে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা খুব ফাঁকা লাগছে, যেন কেউ হৃৎপিণ্ডটা উপড়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, একটা স্বস্তিও অনুভব করছি। মিথ্যে অভিনয়ের চেয়ে এই নির্মম সত্যটা অনেক বেশি সম্মানের।


চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই কান্নাটা দুঃখের, নাকি মুক্তির—আমি জানি না। শুধু জানি, আগামীকালের সকালটা আমার একার হবে। হয়তো কঠিন হবে, খুব কষ্টের হবে। কিন্তু সেই সকালটা হবে মিথ্যেহীন। বৃষ্টির জমা জলে অনিকের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আমি বিড়বিড় করে বললাম, “বিদায় ভালোবাসা। আমরা দুজন হেরে গেলাম, কিন্তু আমাদের স্মৃতিটুকু জিতে থাক।”


রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নিজের ছায়াটাকে বড্ড দীর্ঘ মনে হলো। একলা। কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে। ব্রেকআপ মানেই তো সব শেষ নয়, হয়তো এটা নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার শুরু।


Bengali Breakup Story, Valobashar Golpo, Sad Love Story, Bengali Emotional Story, Koster Golpo, Bangla Uponnash, Heart Touching Story, Bicched, Relationship Advice, Bangla Sahitya

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url